
মেহেরপুরের কৃতী সন্তান সাহিত্যানুরাগী, লেখক ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ আনসার-উল হক একজন আদর্শবান ব্যক্তিত্ব এবং একজন ছাত্র দরদী শিক্ষক। মেহেরপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতকে এগিয়ে নিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। মুহাম্মদ আনসার-উল হক দীর্ঘকাল মেহেরপুর সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। তার জন্ম স্থান মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী আমঝুপী গ্রামে। পড়াশুনা করেন আমঝুপী ও মেহেরপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ও শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। আনসার-উল হক প্রথম জীবনে মেহেরপুর কলেজে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং দীর্ঘকাল এখানে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি মেহেরপুরের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। মেহেরপুরের বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন মীরু সম্পাদিত প্রবাহ পত্রিকা প্রকাশে তিনি ভুমিকা রাখেন। মেহেরপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংগ্রহে তিনি অগ্রণী ভুমিকা রাখেন। মেহেরপুর কলেজে পড়ার সময়ে স্যারকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তিনি ছাত্রদের নিজের সন্তানের মতো ভালো বাসতেন। তাদের সুবিধা-অসুবিধা বুঝার চেষ্টা করতেন। শিক্ষার্থীদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। মেহেরপুর কলেজে আমাদের বাংলা বিভাগে সে সময়ে শিক্ষক ছিলেন শহীদুল্লাহ স্যার,আনসার-উল হক স্যার ও আব্দুল হান্নান স্যার। তারা সকলই ছিলেন ছাত্র দরদী। পড়াতেন চমৎকার। আনসার-উল হক স্যার পরবর্তীতে মেহেরপুর সরকারি কলেজে থেকে বদলি হন চুয়াডাঙ্গার একটি কলেজে এবং পরে তিনি যশোর সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। অবশেষে তিনি যশোর সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। আমাকে নিজের সন্তানের মতো দেখাশুনা করতেন। আমি মেহেরপুরে শিশু সংগঠন ধারাপাত খেলাঘর আসরসহ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছি। স্যার আমাকে এসব ব্যাপারে সহযোগিতা করেছেন। স্যার ধারাপাত খেলাঘর আসরের উপদেষ্টা ছিলেন। ধারাপাতের অনুষ্ঠানে স্যার নিয়মিত আসতেন। ধারাপাতের অনুষ্ঠানগুলো হতো মেহেরপুর পাবলিক লাইব্রেরী ও বিএম স্কুলে। সেসময়ে অনেক সাহিত্যানুষ্ঠান করেছি। স্যার থাকতেন আলোচক। সুন্দরভাবে তিনি লেখাগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন এবং উপদেশ দিতেন। মনে পড়ে, স্যারের পরামর্শ অনুসারে আমি মেহেরপুর থেকে ‘আওয়াজ’ নামে হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম এবং এর প্রকাশনা উৎসবে স্যার পত্রিকার প্রশংসা করে চমৎকার বক্তব্য রেখেছিলেন। পত্রিকাটি বেশ নাম করেছিল। সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে স্যার পরামর্শ দিলেন আমি যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। স্যারের কথামত আমি বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। স্যার আমাকে সবসময়ে বই পড়ার জন্য উপদেশ দিতেন। তাই আমি সে সময়ে শুধু লাইব্রেরীতে পড়ে থাকতাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেন্দ্র মিউজিয়াম লাইব্রেরীতে প্রাচীন অনেক বই পড়ে অনেক উপকৃত হয়েছিলাম। বই পড়ার ক্ষেত্রে তাঁর একটি উপদেশ আমি আজো স্মরণ করি। তিনি আমাকে বলতেন,‘তোমার বেশি সময় নেই। তুমি একটি বই নেড়ে-চেড়ে, সূচিপত্র ও ভুমিকা দেখে রেখে দাও। তবুও তোমার বইটি সম্পর্কে বেশ ধারণা হয়ে যাবে এবং বইটা সম্পর্কে তুমি কিছু বলতেও পারবে। স্যারের এই কথাটা আমার অনেক কাজে এসেছে। মনে পড়ে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও বিশিষ্ট গবেষক মুহাম্মদ আবূ তালিব স্যারকে একবার আমি মেহেরপুরে নিয়ে এসেছিলাম। ছিলেন মেহেরপুরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন মীরু (নাসির ভাইয়ের) বাসায়। আনসার-উল হক স্যারও সবসময়ে সাথে ছিলেন। আমরা মেহেরপুরের গাড়াডোবে মুন্সী শেখ জমিরউদ্দিনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। পরে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ও আমঝুপী কুঠিবাড়িতে গিয়েছিলাম। মনে পড়ে, স্যার তখন মেহেরপুর সরকারি কলেজ থেকে বদলি হয়ে চুয়াডাঙ্গার একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন। থাকতেন চুয়াডাঙ্গা শহরে। হঠাৎ একদিন চুয়াডাঙ্গাতে গিয়ে রাস্তায় স্যারের সাথে আমার দেখা। স্যার জোর করে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেয়ে অনেকক্ষণ কথা বললেন এবং চা নাস্তা খাওয়ালেন। মনে পড়ে, স্যার যখন মেহেরপুর সরকারি কলেজে ছিলেন, তখন তার বাসায় কতবার যে গিয়েছি, তার কোন হিসাব নেই। আনসার-উল হক স্যার এখন অবসরকালীন সময় কাটাচ্ছেন। থাকেন ঢাকায় ছেলের বাসায়। বাঙালি আদর্শ ও সংস্কৃতিকে তিনি বুকে ধারণ করে চলেন তিনি। তিনি একজন আদর্শবান শিক্ষক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। মহান আল্লাহ তায়লার কাছে প্রার্থনা করি আমাদের প্রিয় স্যার যেন ভালো থাকুক এবং দীর্ঘজীবন পান। গ্রন্থনা:অধ্যক্ষ মহসীন আলী আঙ্গুঁর ,সম্পাদক ও প্রকাশক, মুজিবনগর খবর ডট কম,মেহেরপুর।
No comments: